ডেভেলপ — ওয়েবসাইটের ভেতরের কাঠামো
এবার আসি সেই অংশে যা সাধারণত আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু পুরো ওয়েবসাইটকে সচল রাখে। এই অংশকে বলা হয় ব্যাকএন্ড বা ডেভেলপমেন্ট। একটি শিল্পীর ওয়েবসাইটের ব্যাকএন্ডে মূলত তিনটি বড় সিস্টেম কাজ করে — কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS), কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM), এবং ই-কমার্স বা বিক্রয় ব্যবস্থা। এই কারিগরি ব্যবস্থাগুলো ওয়েবসাইট থেকে শিল্পীর প্রয়োজন অনুসারে তৈরি।
যেমন – পরিচিতির সমস্ত কাজ সাপোর্ট করে CMS, বিস্তারের কাজ সামলায় CRM, এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ই-কমার্স সিস্টেম।
কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS)
CMS হলো সেই ব্যবস্থা যার মাধ্যমে আপনি নিজেই ওয়েবসাইটের বিভিন্ন অংশ আপডেট করতে পারবেন — কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান ছাড়াই। একটি ভালো CMS থাকলে আপনার ওয়েবসাইটকে সবসময় জীবন্ত রাখা অনেক সহজ হয়।
১। মাল্টিপল ওয়েব পেজ (Multiple Web Page)
একটি ওয়েবসাইটে অনেকগুলো পেজ থাকে। হোম পেজ, অ্যাবাউট পেজ, গ্যালারি পেজ, কন্টাক্ট পেজ — প্রতিটি পেজের নিজস্ব কাজ আছে। CMS-এর মাধ্যমে এই পেজগুলো তৈরি করা এবং সম্পাদনা করা হয়। প্রতিটি পেজে থাকে মূল তথ্য যা খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। যেমন “About” পেজে আপনার পরিচয় একবার লিখলে বারবার বদলাতে হয় না। এই ধরনের স্থায়ী তথ্যের জন্যই মূলত এই পেজগুলো ব্যবহার হয়।
২। পোস্ট সিস্টেম (Post System)
পোস্ট সিস্টেম হলো ওয়েবসাইটের নিউজফিড বা ব্লগের মতো অংশ। এখানে নিয়মিত নতুন কন্টেন্ট যোগ করা হয় — নতুন কাজের ছবি, সাম্প্রতিক প্রদর্শনীর বিবরণ, কোনো ভাবনার লেখা। পেজ আর পোস্টের মধ্যে তফাৎ হলো — পেজ স্থায়ী, পোস্ট চলমান। পেজ মানে বাড়ির দেওয়াল, পোস্ট মানে সেই বাড়িতে প্রতিদিনের জীবন। একটি সক্রিয় পোস্ট সিস্টেম আপনার ওয়েবসাইটকে সার্চ ইঞ্জিনে উপরে তুলতে সাহায্য করে। কারণ সার্চ ইঞ্জিন নতুন কন্টেন্ট পছন্দ করে।
৩। ইউজার সিস্টেম উইথ লগইন (User System with Login)
যাঁরা আপনার ওয়েবসাইট থেকে কিছু কিনবেন বা সাবস্ক্রাইব করবেন, তাঁদের জন্য একটি অ্যাকাউন্ট তৈরির ব্যবস্থা থাকা দরকার। এই ইউজার সিস্টেম তাদের কেনার ইতিহাস রাখে, পছন্দের কাজ সেভ করে রাখতে দেয়, এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ই-কমার্সের জন্য ইউজার সিস্টেম একটি অপরিহার্য অংশ। কারণ প্রতিটি লেনদেনের সঙ্গে একটি ইউজার অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকলে ট্র্যাকিং, ইনভয়েস, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সবকিছু সহজ হয়ে যায়।
8। কমিউনিটি সিস্টেম (Community System)
কমিউনিটি সিস্টেম হলো সেই ব্যবস্থা যেখানে একই ধরনের মানুষেরা একসঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। যদি আপনার একটি আর্ট স্কুল বা ওয়ার্কশপ থাকে, বা যদি আপনি অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে মিলে কোনো সমষ্টিগত উদ্যোগ চালাতে চান — তাহলে এই কমিউনিটি সিস্টেম কাজে আসে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, ইভেন্টের খবর পেতে পারেন, সম্পদ ভাগ করে নিতে পারেন।
কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM)
CRM শুনলে মনে হয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো জটিল সফটওয়্যার। কিন্তু আসলে একজন শিল্পীর জন্যও CRM-এর নীতিগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। CRM মানে হলো আপনার দর্শক, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা ও রক্ষা করার ব্যবস্থা।
১। ইমেল সাবস্ক্রিপশন সিস্টেম (Email Subscription System)
ইতিমধ্যে আমরা সাবস্ক্রিপশনের কথা বলেছি। কিন্তু শুধু সাবস্ক্রাইব করার বোতাম থাকলেই হয় না। পেছনে একটি সিস্টেম থাকতে হয় যা এই ইমেলগুলো সংগ্রহ করবে, সংরক্ষণ করবে, এবং পরে পাঠানোর সময় ব্যবহার করবে। এই সিস্টেমে সাধারণত একটি ডাবল অপ্ট-ইন প্রক্রিয়া থাকে — মানে কেউ ইমেল দিলে তাকে একটি নিশ্চিতকরণ ইমেল পাঠানো হয়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সত্যিই তিনি সাবস্ক্রাইব করতে চেয়েছেন। এই প্রক্রিয়া আপনার ইমেল লিস্টকে পরিষ্কার এবং সক্রিয় রাখে।
২। নিউজলেটার সিস্টেম (Newsletter System)
নিউজলেটার পাঠানো মানে শুধু একটা ইমেল লিখে পাঠানো নয়। একটি পেশাদার নিউজলেটার সিস্টেম থাকলে আপনি সুন্দর ডিজাইন করা টেমপ্লেটে নিউজলেটার বানাতে পারবেন, নির্দিষ্ট সময়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারবেন, এবং পরে দেখতে পারবেন কতজন সেটা খুলেছেন, কতজন লিংকে ক্লিক করেছেন। এই তথ্যগুলো আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে যে আপনার দর্শকরা কী ধরনের কন্টেন্ট বেশি পছন্দ করছেন।
৩। সাবস্ক্রাইবার ক্যাটাগরি ও অটোমেশন (Subscriber Category and Automation)
সব দর্শক এক নন। কেউ শুধু আপনার কাজের ভক্ত, কেউ সম্ভাব্য ক্রেতা, কেউ অন্য শিল্পী বা সংগ্রাহক। এই বিভিন্ন শ্রেণীর দর্শকদের জন্য আলাদা ধরনের যোগাযোগ কার্যকর। CRM সিস্টেমে সাবস্ক্রাইবারদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করা যায়। আর অটোমেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমেল পাঠানো যায় — যেমন কেউ প্রথমবার সাবস্ক্রাইব করলে একটি স্বাগত ইমেল, কেউ কিছু কিনলে একটি ধন্যবাদ ইমেল। এই অটোমেশন আপনার সময় বাঁচায় এবং দর্শকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ব্যক্তিগত করে তোলে।
৪। ই-কমার্স ইন্টিগ্রেশন (Ecommerce Integration)
CRM এবং ই-কমার্স একসঙ্গে কাজ করলে অনেক শক্তিশালী ফলাফল পাওয়া যায়। যেমন, কেউ একটি ছবি কিনলে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ধন্যবাদ ইমেল যাবে। কিছুদিন পরে তাকে একটি ফলো-আপ ইমেল যাবে নতুন কাজের বিষয়ে। তিনি যদি কখনো কার্টে কিছু রেখে চলে যান, তাহলে তাকে একটি রিমাইন্ডার ইমেল যাবে। এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ আপনার বিক্রি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৫। প্রমোশন সিস্টেম (Promotion System)
বিশেষ অফার, নতুন কাজের লঞ্চ, আসন্ন প্রদর্শনী — এই ধরনের প্রমোশনাল কন্টেন্ট ইমেলের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য একটি আলাদা সিস্টেম থাকা দরকার। এই সিস্টেম আপনাকে সুন্দরভাবে প্রমোশনাল ইমেল ডিজাইন করতে, নির্দিষ্ট গ্রুপে পাঠাতে এবং তার ফলাফল মাপতে সাহায্য করে।
ই-কমার্স — বিক্রয় ও পেমেন্ট ব্যবস্থা
এই অংশটি সরাসরি আপনার উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত। একটি সুগঠিত ই-কমার্স সিস্টেম আপনার শিল্পকর্ম বিক্রিকে সহজ, নিরাপদ এবং পেশাদার করে তোলে।
১। প্রোডাক্ট ডিসপ্লে (Product Display)
প্রতিটি শিল্পকর্মকে একটি পণ্য হিসেবে প্রদর্শন করার জন্য শিল্পমানের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। ছবির একাধিক কোণ থেকে দেখানো, বিস্তারিত বিবরণ, মাপ ও মাধ্যমের তথ্য, মূল্য এবং উপলব্ধতার তথ্য — এগুলো একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে উপস্থাপন করতে হয়। একটি ভালো প্রোডাক্ট ডিসপ্লে দর্শকের মনে আস্থা তৈরি করে। তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি একটি পেশাদার, বিশ্বাসযোগ্য জায়গা থেকে কিনছেন।
২। বিক্রয় ও পেমেন্ট সিস্টেম (Sales and Payment System)
পেমেন্ট গেটওয়ে হলো সেই সেতু যার মাধ্যমে ক্রেতার টাকা আপনার অ্যাকাউন্টে আসে। ভারতে এখন বিভিন্ন নিরাপদ পেমেন্ট গেটওয়ে আছে — ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড, নেট ব্যাংকিং, ইউপিআই, ওয়ালেট — সব ব্যবস্থা থাকলে ক্রেতার সুবিধা হয়। নিরাপত্তার দিক থেকে SSL সার্টিফিকেট এবং নিরাপদ পেমেন্ট প্রটোকল অপরিহার্য। ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর একটি নিরাপদ পেমেন্ট সিস্টেম সেই বিশ্বাস অর্জনে বড় ভূমিকা রাখে।
৩। কাস্টমার হিস্টোরি ও ট্র্যাকিং (Customer History and Tracking)
যাঁরা আপনার কাছ থেকে একবার কিনেছেন, তাঁরা সম্ভাব্য পুনরায় ক্রেতা। তাঁদের কেনার ইতিহাস, পছন্দ, অর্ডারের বিস্তারিত — এগুলো সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকলে আপনি ব্যক্তিগতকৃত সেবা দিতে পারবেন। ক্রেতাও তাঁর নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে আগের অর্ডারের তথ্য দেখতে পারবেন — এই সুবিধা তাঁদের আস্থা বাড়ায়।
৪। ইনভয়েস সিস্টেম (Invoice System)
প্রতিটি বিক্রয়ের পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি পেশাদার ইনভয়েস তৈরি হওয়া উচিত। এটি শুধু ক্রেতার সুবিধার জন্য নয়, আপনার নিজের হিসাবের জন্যও দরকার। একটি ভালো ইনভয়েস সিস্টেম আপনার শিল্পব্যবসাকে পেশাদার রূপ দেয়। কর হিসাব, বার্ষিক বিবরণ — এই সব কাজে ইনভয়েসের রেকর্ড অপরিহার্য।
৪। ডিসকাউন্ট ও অফার (Discount and Offers)
কুপন কোড, বার্ষিক ছাড়, বিশেষ উপলক্ষের অফার — এগুলো পরিচালনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সিস্টেম দরকার। এই সিস্টেমে আপনি নিজেই বিভিন্ন ছাড়ের নিয়ম তৈরি করতে পারবেন, নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারবেন, এবং ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে পারবেন।